কালের সাক্ষী, প্রকৃতির ক্যানভাস
ক্যামেরার লেন্স যতই আধুনিক হোক না কেন, মাটির সোঁদা গন্ধ আর শেকড়ের টান ফ্রেমে বন্দি করা কঠিন। দক্ষিণ তুলাগাঁও তেমনই এক জীবন্ত ক্যানভাস, যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে শতবর্ষের ইতিহাস। চারপাশের বিস্তীর্ণ সবুজ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রাচীন মুরুব্বিরা এর নাম রেখেছিলেন “দক্ষিণ তুলাগাঁও”—একটি নাম, যা মাটির গন্ধ আর মানুষের ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।
সময় বদলেছে, নদীর স্রোতও হয়তো আজ শান্ত; কিন্তু গ্রামের প্রাণস্পন্দন থেমে নেই। গ্রামের সামনে দিয়ে বয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী কার্জন খাল, যা একসময় ছিল যাতায়াত ও জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। এই খাল যেন গ্রামের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ধারা, যা আজও গ্রামবাসীর স্মৃতি আর জীবনের অংশ হয়ে আছে।
দক্ষিণ তুলাগাঁওয়ের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—গ্রামের দুই পাশ দিয়ে বিস্তৃত রাস্তা, যা একে সহজে সংযুক্ত করেছে আশেপাশের জনপদের সাথে। এই পথগুলো শুধু চলাচলের মাধ্যম নয়, বরং গ্রামের উন্নয়ন, যোগাযোগ ও প্রগতির প্রতীক।
এই গ্রামে শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ বসবাস করে, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে জীবনযাপন করে আসছে। পারস্পরিক সহযোগিতা, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ এই গ্রামের মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি।
এটি শুধু একটি গ্রাম নয়—এটি এক ইতিহাস, এক অনুভূতি, এক আত্মপরিচয়; যেখানে প্রতিটি পথ, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি মানুষের মাঝে লুকিয়ে আছে মাটির গভীর টান আর শেকড়ের অমলিন গল্প।
দক্ষিণ তুলাগাঁও গ্রামটি কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার ৭নং ভাউকসার ইউনিয়নের অন্তর্গত একটি শান্ত ও মনোরম লোকালয়। সমতল ও উর্বর পলল ভূমিতে অবস্থিত এই গ্রামের চারপাশ সবুজ ফসলের মাঠ, গাছপালা এবং ছোট-বড় জলাশয়ে পরিবেষ্টিত। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক অনুকূল পরিবেশ এই ভৌগোলিক এলাকাটিকে করেছে প্রাণবন্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ।
প্রতিটি সংখ্যা এখানে নিছক পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যা এক একটি জীবনের গল্প বলে। পুরুষ, নারী, আবালবৃদ্ধবনিতা—সবাই মিলে এই গ্রামের মূল চালিকাশক্তি।
গ্রামের শতকরা ৬০ ভাগ মানুষের জীবন ও জীবিকা আবর্তিত হয় কৃষিকে কেন্দ্র করে। ধান, পাট এবং আধুনিক মাছ চাষ গ্রামের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে। এছাড়া প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এবং একটি দাখিল মাদরাসা গ্রামের নতুন প্রজন্মের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে অবিরাম।
গ্রামের কেন্দ্রস্থলে গড়ে ওঠা আধুনিক কমিউনিটি ক্লিনিকটি মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসায় আশীর্বাদস্বরূপ। বিনামূল্যে ঔষধ ও পরামর্শ পেয়ে সাধারণ মানুষ আজ স্বাস্থ্য সচেতন।
ধর্মীয় উৎসব থেকে শুরু করে বৈশাখী মেলা, গ্রামীণ হা-ডু-ডু কিংবা স্কুল মাঠের ক্রিকেট—সবকিছু মিলিয়ে এখানে বিরাজ করে এক উৎসবমুখর আবহ।
গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে এসেছে মোজাম্মেল হক ফাউন্ডেশন। ঈদ উপলক্ষে বিশেষ আর্থিক অনুদান প্রদানের মাধ্যমে গ্রামের অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে এই সামাজিক সংগঠন। মোজাম্মেল হক ফাউন্ডেশন বিশ্বাস করে, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমেই একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে গ্রামের প্রধান বাজার থেকে স্কুল পর্যন্ত রাস্তা পাকাকরণের কাজ আজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে।